বছরে অর্ধেকের বেশি সময় বন্যা ও নদী ভাঙনের সাথে সংগ্রাম চলে স্থানীয়দের। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে স্বাস্থ্য-শিক্ষার মত মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে এখানকার বাসিন্দাদের। তাই দেশের অন্যতম পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, কুড়িগ্রামের রাজিবপুর-রৌমারী উপজেলার অন্তর্গত ব্রহ্মপুত্র নদীগর্ভে অবস্থান করা চরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে বিশেষ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সামাজিক সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। এর মধ্যে অন্যতম রৌমারীর দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের আমবাড়ী ফ্রেন্ডশিপ বিদ্যালয়। প্রত্যন্ত আমবাড়ী গ্রামে অবস্থিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আলো ছড়াচ্ছে এ বিশেষ বিদ্যালয়।
প্রত্যন্ত আমবাড়ী গ্রামে অবস্থিত ফ্রেন্ডশিপ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও হয়ে উঠেছেন আশাবাদী। এ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশামনি জানান, প্রান্তিক চরের মানুষের সেবায় চিকিৎসক হতে চান তিনি। এ বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “মানুষ হওয়ার জন্য লেখাপড়া করতে চাই। এজন্য আমি মাস্টার্স পর্যন্ত লেখা-পড়া করতে চাই।” আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ”আমি লেখাপড়া করে বিচারক হতে চাই। তারপর বিয়ে করবো। এর আগে নয়।”
ফ্রেন্ডশিপ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসান আলী বলেন, “আমার অনেক সহপাঠী এখান থেকে ফাইভ পাস করে অন্য স্কুলে চলে গেছে। আমরা এখানে লেখাপড়া অব্যাহত রেখেছি। কারণ, এ স্কুল আমাদের ভাল লাগে। আমরা লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা করি। যেমন- ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, ভলিবল, আরও অনেক ধরণের খেলা।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্মৃতি চারণ করেন মাধ্যমিক পর্যায়ের এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, “আগে আমাদের স্কুল ছিলো একদম শুকনো মরুভূমির মত। একপাশে ছিলো বাঁশ বাগান। এখন গাছ-পালা হয়েছে। আমাদের এখানে খেলাধুলার অনেক সুযোগ আছে।
আমবাড়ী ফ্রেন্ডশিপ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইদুজ্জামান বলেন, “আমরা নীতিকথাগুলো শেখাই। যাতে তারা একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা অর্জন করে, যা তাদের জীবনে কাজে লাগে। পাশপাশি, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সাথে যুক্ত রাখা, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া ঠেকানো, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সভা, সেমিনার এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করি আমরা।”
প্রত্যন্ত চরে ফ্রেন্ডশিপ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নিজেদের জমি দেয়ার কারণ বর্ণনা করেন আমবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, “এই প্রত্যন্ত এলাকার ছেলে-মেয়ারা লেখা-পড়ায় ভাল করতে পারে, উচ্চ শিক্ষিত হতে পারে, সেজন্য আমরা এখানে স্কুল প্রতিষ্ঠায় জমি দান করেছি। ২০১৯ সালে আমরা জমি দিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে এগিয়ে আসি। কারণ চারপাশে প্রায় কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোন বিদ্যালয় নেই। আমবাড়ী গ্রামের বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমরা এ কাজ করি। আমার ছেলেও ফ্রেন্ডশিপ প্রথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেনি পর্যন্ত লেখা-পড়া করে এখন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করা আমবাড়ী ফ্রেন্ডশিপ বিদ্যালয় থেকে এ পর্যন্ত ৫ম শ্রেণি পাশ করেছে ১৪৬ জন শিক্ষার্থী। আর এসএসসি পাশ করেছে ৩৮ জন শিক্ষার্থী। বর্তমান প্রাথমিক শাখায় লেখাপড়া করছে ১৫২ জন, আর মাধ্যমিক শাখায় ৩৬ জন শিক্ষার্থী।
স্থানীয়রা জানান, সার্বিকভাবে রৌমারীর প্রান্তিক চরবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে এখানকার ‘আমবাড়ি ফ্রেন্ডশিপ বিদ্যালয়’।