কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার অষ্টমীরচর ইউনিয়নের তিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম। এতে করে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ। স্থানীয়রা বলছেন, শিক্ষক সংকটের কারনে বিদ্যালয়ে কমছে উপস্থিতি, ঝরে পড়ছে কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাজীবন।
সরেজমিনে অষ্টমীরচরের চর মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সহকারী শিক্ষক সাইদ মোহাম্মদ সা'দ একাই নিচ্ছেন পাঁচ শ্রেণির ক্লাস। কাগজ-কলমে সেখানে আরো দুইজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও একজন সহকারী শিক্ষক রয়েছেন বিটিপিটি প্রশিক্ষণে আর প্রধান শিক্ষক জিয়ারা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন অনুপস্থিত।
শিক্ষক হাজিরা খাতা দেখে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক জিয়ারা খাতুন চিলমারী উপজেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি আর বিদ্যালয়ে আসেননি। উপজেলা শিক্ষা অফিসে খোঁজ নিয়ে ছুটি নেওয়ারও কোনো প্রমাণ মেলেনি। অথচ মাসের পর মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেই তুলছেন বেতন।
রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করে প্রধান শিক্ষক জিয়ারা খাতুন বলেন, আপনার কাছে তো আর মিথ্যা বলা যাবেনা, আমি চিলমারী উপজেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের রানিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক।
বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকালীন আমি ছুটি নিয়েছিলাম, এরপর কিছুদিন বিদ্যালয়ে গিয়েছি। বাড়ি থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বিদ্যালয়ে যাওয়া অনেক কষ্টকর।
চিলমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. কামরুজ্জামান বলেন, চর মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়ারা খাতুন অসুস্থতাজনিত কারনে কিংবা কোনো ধরনের ছুটি নেয়নি।
রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, জানতে পেরেছি সে রাজনীতির সাথে জড়িত। আমরা তাকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এক শিক্ষার্থী অভিভাবক বলেন, এই স্কুল ছেলে-মেয়েদের জীবন গড়ার নয়, জীবন নষ্ট করার মেশিন। প্রধান শিক্ষক স্কুলে আসেনা, একমাত্র সহকারী শিক্ষক সেও আসে দুপুর ১২ টায়। ১ম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসে আর যায়। একজন শিক্ষক দিয়ে সব শ্রেণির ক্লাস নেওয়া কীভাবে সম্ভব।
একই ইউনিয়নের মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুর আড়াইটায় গিয়ে দেখা যায়, সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম একাই সামলাচ্ছেন তিন শ্রেণির ক্লাস। একবার এক শ্রেণিতে পড়া দিয়ে দৌড়াচ্ছেন আরেক শ্রেণিতে। এছাড়াও অফিসিয়াল কাগজ পত্র, মিডডে মিলের হিসাব, উপস্থিতি রেজিস্ট্রার, সরকারি বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রম সবই করতে হচ্ছে একাই।
কাগজে কলেম সেখানে মাসুমা আক্তার নামের আরেকজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও তিনি ২০২৩ সালে যোগদান করে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার পর এখন পর্যন্ত চিলমারী শহরের এক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে রয়েছেন। মাত্র দুইজন শিক্ষকের মধ্যে থেকে একজনকে ডেপুটেশন দেওয়ার ঘটনা বিস্মিত করেছে স্থানীয়দের।
দুই বছর আগে অবসরে যাওয়া ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার সময় ওই বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রী ছিলো প্রায় ২৫০ জন। বর্তমানে রয়েছে মাত্র ১৫৭ জন। তারমানে শিক্ষক সংকটে বিদ্যালয়ে ক্লাস না হওয়ায় বাকি শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়েছে।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসি মনি বলেন, একজন স্যার আমাদের সব শ্রেণির ক্লাস নেন। স্যার একা আমাদের বেশি সময় দিতে পারেনা তাই আমরা বেশি শিখতেও পারিনা। আমাদের স্কুলে আরো স্যার থাকলে আমরা বেশি শিখতে পারতাম।
একমাত্র শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় এক বছর থেকে আমি একাই সব শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছি। এরপরও অফিসিয়াল সব কাজ আমাকেই করতে হয়। একা ক্লাস নিতে অনেক কষ্ট হয় কিন্তু চরের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা জীবনের চিন্তা করে করতে হচ্ছে। এখানে শিক্ষক আসে কিন্তু বেশি দিন থাকেনা, বদলি হয়ে শহরের স্কুলে চলে যায়।
ওই ইউনিয়নের দক্ষিণ নটারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র আরো ভয়াবহ। ২০২২ সাল থেকে একজন শিক্ষক দিয়েই চলছে বিদ্যালয়টির সমস্ত কার্যক্রম। এজন্য প্রতিদিন দুপুর ১২ টা বাজতেই দেয়া হয় ছুটি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কিছু শিক্ষার্থী থাকলেও তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে ১২ জন, পঞ্চম শ্রেণিতে ২ জন আর চতুর্থ শ্রেণিতে নেই একজনও।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বছরের পর বছর এভাবেই চলছে এই বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম। প্রায় পাঁচ বছর আগে এই বিদ্যালয়ে দুইজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো। দূরের হওয়ার কারনে তারাও সঠিক সময় উপিস্থিত হতে পারেনি। এসে শুধু হাজিরা সই করেই চলে যেতো। ফলে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার পরও ব্যাহত হয়েছে পাঠদান কার্যক্রম।
বিপ্লব ও আতিকুর নামের স্থানীয় দুই যুবক বলেন, এই স্কুল প্রতিদিন দুপুর ১২ টায় ছুটি হয়। দূরের শিক্ষকরা এসে এখানে থাকেনা। মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে কি স্কুল চালানো সম্ভব?
সাজেদা বেগম নামের এক শিক্ষার্থী অভিভাবক বলেন, যেখানে চার-পাঁচজন শিক্ষক থাকার কথা সেখানে ম্যাডাম একাই কয়টা ক্লাস নেবেন। সরকার তো সব শহরের শিক্ষক নিয়োগ দেয় কিন্তু তারাতো চরে এসে ক্লাস নিতে পারেনা। কিছুদিন পর আবার শহরে চলে যায়।সরকার কী চরের শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের নিয়োগ দিতে পারেনা?
একমাত্র শিক্ষক রোজিনা বেগম বলেন, ২০২২ সাল থেকে আমি একাই এই স্কুলে অনেক কষ্ট করে ক্লাস নিচ্ছি। সব শ্রেণির ক্লাস নেওয়া, বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল কাজ করা সব একাই আমাকে করতে হয়। চিলমারী থেকে এর আগে কয়েকজন শিক্ষিক এসেছিলো কিন্তু তারা কিছুদিন পরই চলে যায়। চরের ছেলেদের এখানে নিয়োগ দিলে স্কুলটি ভালোভাবে চালানো সম্ভব।
এছাড়াও চিলমারী উপজেলার চরাঞ্চলের ২৮ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে নয়ারহাট ইউনিয়নের খেরুয়ারচর স.প্রা.বিদ্যালয়ে ২ জন, উত্তর খাউরিয়া স.প্রা.বিদ্যালয়ে ৩ জন, চর খেদাইমারী স.প্রা.বিদ্যলয়ে ৩ জন, অষ্টমীর চর ইউনিয়নের নাওশালা স.প্রা.বিদ্যালয়ে ২ জন, কালিকাপুর স.প্রা.বিদ্যালয়ে ৩ জন, ভাটপাড়া স.প্রা.বিদ্যালয়ে ৩ জন, খামার বাঁশপাতারি স.প্রা.বিদ্যালয়ে ৩ জন, দিঘলকান্দি স.প্রা.বিদ্যালয়ে ৩ জন এবং চিলমারী ইউনিয়নের মনতলা স.প্রা.বিদ্যালয়ে ২ জন, চর শাখাহাতি স.প্রা.বিদ্যালয়ে ২ জন, চর বলদিয়ার খাতা স.প্রা.বিদ্যালয়ে ৩ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম। এ উপজেলার ৯৩ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৪ টি পদ খালি রয়েছে যার অধিকাংশই চরাঞ্চলে অবস্থিত।