রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্যারিয়ার ক্লাব প্রতিষ্ঠা থেকে বহুমুখী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব—সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাওনের পথচলা দেখায়, নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যে নয়, বরং অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরি করার মধ্যেই নিহিত।
সব উদ্যোক্তার গল্প একই রকম নয়। কেউ ব্যবসা শুরু করেন লাভের লক্ষ্য নিয়ে, আবার কেউ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে। সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাওনের যাত্রা দ্বিতীয় ধারার। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার উন্নয়নের প্রথম প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, করপোরেট জীবনে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন, তারপর স্থিতিশীল চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন পথচলা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর গল্পটি কেবল একজন ব্যবসায়ীর নয়; এটি নেতৃত্ব, আস্থা, মূল্যবোধ এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণের গল্প।
ক্যাম্পাসে যে বীজ রোপণ হয়েছিল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তখনও ক্যারিয়ার উন্নয়ন নিয়ে সংগঠিত উদ্যোগ খুব একটা দেখা যেত না। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য ছিল ভালো ফল করা, এরপর চাকরির প্রস্তুতি। কিন্তু সৈয়দ আবদুল্লাহ শাওন বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরিরও ক্ষেত্র।
সেই ভাবনা থেকেই ২০১৩ সালের জুনে প্রতিষ্ঠা করেন *রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ক্যারিয়ার ক্লাব (RUCC)—উত্তরাঞ্চলের প্রথম শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার উন্নয়ন সংগঠন। প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন মাসের মাথায় আয়োজন করা হয় **Career Fair 2013*, যা ছিল তৎকালীন প্রায় ৬০ বছরের ইতিহাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্যারিয়ার ফেয়ার।
এই আয়োজন কেবল একটি অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর মাধ্যমে ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী চাকরির সুযোগ পান। শাওনের কাছে এটাই ছিল প্রকৃত সাফল্য—নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া।
এরও আগে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং ফোরাম (RUDF)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নেতৃত্ব, যোগাযোগ এবং দল পরিচালনার দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক জীবনে এসব অভিজ্ঞতাই হয়ে ওঠে তাঁর অন্যতম ভিত্তি।
পরিবারের শিক্ষা, জীবনের ভিত্তি
সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাওনের বেড়ে ওঠা একটি মূল্যবোধনির্ভর মুসলিম পরিবারে। তাঁর প্রয়াত বাবা ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এবং মা পরিবার গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করেছেন নিবেদিতভাবে। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হওয়ায় তিনি এমন একটি পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে শিক্ষা, শৃঙ্খলা এবং সততা ছিল প্রতিদিনের অনুশীলনের অংশ।
তিনি মনে করেন, পেশাগত জীবনে যে সিদ্ধান্তগুলো তাঁকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল পরিবারেই।
তাঁর ভাষায়, *”আমার বাবা-মা ছোটবেলা থেকেই আমাকে সততা, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমের গুরুত্ব শিখিয়েছেন। ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সেই শিক্ষাই আমাকে পথ দেখিয়েছে।”*
বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ জীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপক হয়ে ওঠা বাবার সংগ্রামের গল্প তাঁর কাছে আজও অনুপ্রেরণার উৎস। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, প্রকৃত সাফল্যের ভিত্তি সুবিধা নয়, অধ্যবসায়।
Sayed Abdullah Shaon
করপোরেট জীবন: শেখার আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়
২০১৪ সালের জুনে সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাওনের জীবনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি *BAT Bangladesh*-এ টেরিটরি অফিসার হিসেবে যোগ দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া প্রথম গ্র্যাজুয়েট হিসেবে এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
পরবর্তী আট বছর তিনি বিক্রয় ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান।
তবে তিনি করপোরেট জীবনকে কখনোই শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখেননি। বরং এটিকে দেখেছেন শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে।
অভিজ্ঞ সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, একটি সফল প্রতিষ্ঠান কেবল দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; আস্থা, জবাবদিহি এবং পেশাদারিত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
করপোরেট জীবনের আরেকটি মূল্যবান অর্জন ছিল সম্পর্ক। পরবর্তী সময়ে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করলে তাঁর অনেক সাবেক সহকর্মী, সুপারভাইজার এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিনিয়োগকারী হিসেবে পাশে দাঁড়ান। বর্তমানে তাঁর বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৬০ শতাংশই করপোরেট জীবনের সেই পেশাগত নেটওয়ার্কের অংশ।
তাঁর কাছে এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; বরং দীর্ঘদিনের বিশ্বাসযোগ্যতার স্বীকৃতি।
নিরাপদ চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত উদ্যোক্তা জীবন
একটি প্রতিষ্ঠিত করপোরেট ক্যারিয়ার ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়া সহজ সিদ্ধান্ত নয়। নিয়মিত আয়, পেশাগত নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠিত অবস্থান ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন পথে হাঁটার সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা থাকে।
তবু ২০২২ সালের জুলাইয়ে সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাওন প্রতিষ্ঠা করেন *Real Star Properties Limited*। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু একটি নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহসী পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, *”সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু নিজের স্বপ্ন এবং পরিকল্পনার ওপর আমার আস্থা ছিল।”*
পরবর্তীতে রিয়েল এস্টেটের পাশাপাশি তিনি হসপিটালিটি, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগেও সম্পৃক্ত হন। বর্তমানে তিনি *Real Star Properties Limited-এর প্রতিষ্ঠাতা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা; **Laurel Lakefront Hotel-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক; **Star Agro-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং **Real Star Society*-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
Sayed Abdullah Shaon
নেতৃত্বের সংজ্ঞা
সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাওনের নেতৃত্বের দর্শন তিনটি শব্দে সংক্ষেপ করা যায়—নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা, সততা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা।
তিনি বিশ্বাস করেন, দ্রুত সাফল্যের চেয়ে টেকসই সাফল্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সাফল্য আসে ধৈর্য, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে।
তাঁর বক্তব্য, *”শেখা কখনো থামানো যাবে না, সততার সঙ্গে আপস করা যাবে না এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।”*
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কঠিন সময়গুলোতে পবিত্র কোরআনের সেই আশ্বাস থেকেই শক্তি পান—কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। তাঁর বিশ্বাস, প্রতিকূলতা সাময়িক; কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়া স্থায়ী।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
আগামী এক দশকে তিনি এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান, যা শুধু ব্যবসায়িক সফলতার জন্য নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা, গ্রাহকের বিশ্বাস এবং সমাজে ইতিবাচক অবদানের জন্যও পরিচিত হবে।
রিয়েল এস্টেট, হসপিটালিটি, কৃষি, শিক্ষা, তৈরি পোশাক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সামাজিক উন্নয়ন—বিভিন্ন খাতে তাঁর পরিকল্পনা বিস্তৃত। পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ, উদ্যোক্তা তৈরি এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের জন্য আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে।
তাঁর বিশ্বাস, একজন মানুষের প্রকৃত সাফল্য কেবল তিনি কী অর্জন করেছেন, তা দিয়ে নয়; বরং তাঁর কাজের মাধ্যমে অন্য মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাস থেকে শুরু হওয়া সেই নেতৃত্বের গল্প আজ একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে পৌঁছেছে। তবে সৈয়দ আব্দুল্লাহ শাওনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই যাত্রার লক্ষ্য এখনও একই—নিজের জন্য নয়, এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জন্য কাজ করবে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেবে।

