স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বার্তা পেলেই প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়ে যাবে। জাতীয় সংসদ থেকে এ বিষয়ে প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ৪৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তবে নির্বাচনের সময় নির্ধারণে এইচএসসি পরীক্ষা, বর্ষকালসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এসব বিবেচনায় নিতে হবে।
কোন নির্বাচন আগে করতে হবে সে বিষয়েও সরকারের পরামর্শ দরকার। ইসির ধারণা, বছরের শেষের দিকেই নির্বাচন শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আগেই উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের সম্ভাবনা বেশি।
গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ কালের কণ্ঠকে এসব কথা জানান।
উপজেলা নির্বাচন আগে হতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা জানা গেছে গত শনিবার বিএনপি ও দলটির তিন অঙ্গসংগঠনের জেলা নেতাদের মতবিনিময়সভায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে। তিনি উপজেলা নির্বাচনের কথা বলেছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে সরকারের তরফ থেকেও বলা হচ্ছে, চলতি বছরের শেষের দিকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু হতে পারে। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকরা এরই মধ্যে জনসংযোগে নেমে পড়েছেন। পোস্টার-ব্যানার টানাচ্ছেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক সভা-সমাবেশে সম্ভাব্য প্রার্থীরা সরব হচ্ছেন।
তবে নির্বাচন কমিশন এখনো সংশোধিত স্থানীয় সরকার আইনগুলোর বিধিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করেনি।
এই পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, সরকার যে সময়ের মধ্যে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে বলবে, সেই সময়ের মধ্যে সেই নির্বাচন যাতে আমরা করতে পারি তার প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছে।
আগামীকাল বুধবার এ বিষয়ে একটি মিটিং হতে পারে। কাজের অগ্রগতি কী হলো, কী কী করতে হবে, নিজেদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা বসব ইনশাআল্লাহ।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন নিয়ে আমাদের কিছু বলেনি। জাতীয় সংসদের একটি প্রশ্নের উত্তরে আমরা জানিয়েছি, ৪৫ দিনের ভেতরে আমরা প্রস্তুত হতে পারব। পাশাপাশি আমরা বলেছি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাসহ কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় মিলিয়ে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করতে হবে। আইনে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সে অনুযায়ী কিছু বিধিমালাও চেঞ্জ করতে হবে। এসব বিষয়ে শিগগিরই কাজ শুরু হবে।’
ইসি মাছউদ বলেন, ‘আমার মনে হয়, অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগবে নির্বাচন শুরু করতে। সে সময়ের খুব দেরি নেই। একটু আগে আমি এক জায়গা থেকে এলাম। দেখলাম, সেখানে সরকারের এক মন্ত্রীর ছবিসহ পোস্টার সাঁটানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ওমুককে মেয়র হিসেবে দেখতে চাই। আমার ধারণা, আগে উপজেলা আর পৌরসভা নির্বাচন হতে পারে।’
ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, জাতীয় সংসদে সম্প্রতি স্থানীয় সরকারের যে আইনগুলো পাস হয়েছে তার সঙ্গে সমন্বয় করে বিধিমালা তৈরি করতে হবে। নির্বাচন কমিশন বসে নেই। নির্বাচনের জন্য মালপত্র ক্রয় থেকে শুরু করে বিধি-বিধান কী হবে না হবে, যে কাজগুলো আমাদের করতে হবে, তা আমরা করে রাখছি। যাতে সরকার নির্বাচন চায় আর আমরা করতে পারছি না, এমনটা যেন না হয়। আইনসংক্রান্ত সবকিছু আমরা প্রস্তুত করে আইন শাখার মতামত নিয়ে তারপর ভেটিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাব।
এ ছাড়া ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কয়েক দিন আগের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করলে কিভাবে তা রোধ করা যায় সে বিষয়েও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিদেশে থাকা সম্পদের পরিমাণ হলফনায় যুক্ত করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারের সুযোগ দিতে চায় ইসি। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিতসংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষরের বিধান বাতিল করার বিষয়টি আচরণবিধিমালায় আনতে চায় সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে বলে অনেকের ধারণা। প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত শনিবার দলের জেলা পর্যায়ের নেতাদের এই বার্তা দিয়েছেন যে এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রশাসনকে ব্যবহার করে জিতে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না।
নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে গত রবিবার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দেশের ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৩৩টি পৌরসভার মেয়র, ৬৭টি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। দলটির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। আসন্ন ঈদুল আজহার আগে ২০ মে আরো ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরাও নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছেন।
প্রসঙ্গত, উপজেলা পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০২৪ সালে বিতর্কিত এবং ‘আমি-ডামি, নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ওই বছরের ৮ মে থেকে ৯ জুন পর্যন্ত। বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচন বর্জন করে। এই অবস্থায় দলীয় প্রার্থী দেওয়ার বিধান থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করতে দলগত প্রার্থী দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই বিজয়ী হন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে অনুষ্ঠিত সিটি ও পৌরসভা নির্বাচনেও একই চিত্র দেখা যায়। কার্যত জেলা ও উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রায় সব শীর্ষ পদই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে ছিল। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব জনপ্রতিনিধির অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। তাঁদের মধ্যে উপজেলার চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিদায় নিতে হয়।
ওই বছরের ১৯ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সব (৪৯৩টি) উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে এবং তাঁদের জায়গায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সময় দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র, তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদেরও অপসারণ করা হয়। পরে ২৬ সেপ্টেম্বর অপসারণ করা হয় সিটি ও পৌরসভার কাউন্সিলরদের। অপসারণ করা মেয়র ও চেয়ারম্যানদের জায়গায় সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
তার আগে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’, ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’, ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ ও ‘উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাদেশে এই মর্মে বলা হয়, বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যাবশ্যক বিবেচনা করলে সরকার জনস্বার্থে কোনো সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরকে অপসারণ করতে পারবে। একইভাবে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের অপসারণ করতে পারবে। একই সঙ্গে এগুলোয় প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে সরকার।
বর্তমান সরকারও ৫৬ জেলা পরিষদ ও ১১ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করেছে।