অন্তর্বতীকালীন সরকারের সময় জামায়াত ও এনসিপির সুপারিশে নিয়োগ ডিসিরা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক জেলা প্রশাসকের মাঠে কাজ করার অভিজ্ঞতা শেষ হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুসারে ডিসি সম্মেলন শেষে নতুনপ্রশাসক নিয়োগ দেয়ার কথা। তার পরেও তারা মাঠে রয়েছে। বর্তমান মাঠে চার ব্যাচ বিসিএস-২৫, বিসিএস-২৭, বিসিএস-২৮ ও বিসিএস-২৯ ব্যাচের কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে অন্তর্বতীকালীন সরকারের সময় জামায়াত ও এনসিপির সুপারিশে নিয়োগ বির্তকিত ডিসিদের প্রত্যাহার করা হবে বলে জানা গেছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরে প্রথম চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন গত ৬ মে শেষ হয়েছে। এর আগে এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিসি নিয়োগ নিয়ে এক মহা কেলেঙ্কারি কা- বেধে গিয়েছিল। তখন জনপ্রশাসন সচিব পদে ছিলেন ড. মোখলেস উর রহমান। অনেকটা তড়িঘড়ি ফিটলিস্ট তৈরি করে এক সঙ্গে ৫৯ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেয়া হয়। ওই নিয়োগে ড. মোখলেস এর নেতৃত্বে ব্যাপকহারে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠে। নিয়োগ বাতিল চেয়ে নজিরবিহীনভাবে সচিবালয়ে বিক্ষোভ করেন আওয়ামী লীগ আমলের ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তারা। হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। ডিসি নিয়োগ দেওয়া নয়জন কর্মকর্তাকে পরে সরিয়ে নেওয়া হয়। ডিসি নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভও হয়। নিয়োগে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারকে। তখন পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদে নেমেছিলেন। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতার আসার পরে মাঠ প্রশাসনে ডিসি নিয়োগ নিয়ে সেই কেলেঙ্কারি বন্ধ হয়েছে। নতুন ডিসি নিয়োগে ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের গত ৭ এপ্রিল পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে বিসিএস ২৮তম ব্যাচের প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার। ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তারা হাজির হয়েছেন পরের দিন। ২৮তম ব্যাচের আরও কিছু কর্মকর্তাকে ডাকা হয় ৯ এপ্রিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একাধিক জেলার ডিসিকে প্রত্যাহার করে নতুন ডিসি নিয়োগ দেয়া কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রশাসনের যেসকল কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কাজ করেছেন। তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা তাদের খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছে।
অন্তর্বকালীন সরকারে আমলে নিয়োগ পাওয়া সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে সম্প্রতি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার ইস্যুতে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। পরে সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির ১০ দিন পরও কর্মস্থলে যোগ দেননি মু. রেজা হাসান। ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরও কী কারণে তিনি ওই পদে এখনো যোগ দেননি, এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্যও দিতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, (ডিসির যোগদান করা কিংবা না করা) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। আমাদের এ বিষয়ে কিছু জানা নেই। তবে সরকারদলীয় সিলেটের স্থানীয় একটি রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে মু. রেজা হাসানের নিয়োগের বিষয়টি স্থানীয় একজন মন্ত্রীর মনঃপূত হয়নি। বিষয়টি তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছেন। এখন সিলেটে আবার নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন হতে পারে। তবে জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারের কারণ কিংবা নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে কে দায়িত্ব নেবেন, তখন জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আসলে অন্তর্বতীকালীন সরকারের সময় জামায়াত ও এনসিপির সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া ডিসিরা প্রত্যাহার করা হবে। ইতোমধ্যে অনেক ডিসিকে প্রত্যাহার করার কাজ শুর হয়েছে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সংসদে নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হেলালীর প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী দৃঢ়তার সাথে বলেন, বর্তমান জনপ্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যেকোনো রাজনৈতিক বা অন্যায্য প্রভাবমুক্ত রাখা হচ্ছে এবং মেধা, সততা ও দক্ষতাকে একমাত্র মানদ- হিসেবে ব্যবহার করার নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা তাদের খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছে।
গত ২৮ জুন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত মু. রেজা হাসানকে সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে জানায়। ওই প্রজ্ঞাপন জারির পর রেজা হাসান কুমিল্লার ডিসির দায়িত্ব ছাড়লেও সিলেটে আর যোগ দেননি। গত ১ এপ্রিল ৪ দেশের চার জেলার ডিসি প্রত্যাহার করেছে সরকার। তাদের প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। যাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন,পাবনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. শাহেদ মোস্তফা, ঠাকুরগাঁওয়ের ইশরাত ফারজানা, ভোট চুড়ির অভিযোগে রংপুরের মোহাম্মদ এনামুল আহসান ও রাজবাড়ীর সুলতানা আক্তার। এসব জেলার বর্তমান জেলা প্রশাসকদের পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। আর এসব জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথোরটির পরিচালক (উপসচিব) আফরোজা পারভীনকে রাজবাড়ী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ রফিকুল হককে ঠাকুরগাঁও, একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আমিনুল ইসলামকে পাবনা এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে রংপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ১ মার্চ দেশের পাঁচ জেলার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁদের পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে প্রত্যাহার করা জেলা প্রশাসকেরা হলেন গাজীপুরের মোহাম্মদ আলম হোসেন, পঞ্চগড়ের কাজী মো. সায়েমুজ্জামান, কুষ্টিয়ার মো. ইকবাল হোসেন, নেত্রকোনার মো. সাইফুর রহমান এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিসি মো. শাহাদাত হোসেন মাসুদ।
গত ২০২৫ নভেম্বর মাসে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২৩ জেলায় নতুন ডিসি পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে অন্তর্বকালীন সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একাধিক জেলার ডিসিকে প্রত্যাহার করে নতুন ডিসি নিয়োগ দেয়া কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া পাঁচ দিন আগে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া দুজনের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে ৫০টি জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ করা হয়। জাতীয় নির্বাচনে ডিসিরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। ফলে এই পদটি নির্বাচনের আগে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা তাদের রাখা হয়। নারায়ণগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে চট্টগ্রামের ডিসি, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক এস এম মেহেদী হাসানকে লক্ষ্মীপুর, পরিকল্পনা বিভাগের উপসচিব সৈয়দা নুরমহল আশরাফীকে মুন্সিগঞ্জ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. সাইফুর রহমানকে নেত্রকোনা, অর্থ বিভাগের উপসচিব মো. শাহাদাত হোসেন মাসুদকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে নওগাঁ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আনোয়ার সাদাতকে খাগড়াছড়ি, রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মু. রেজা হাসানকে কুমিল্লা এবং জনবিভাগের উপসচিব মো. রায়হান কবিরকে নারায়ণগঞ্জের ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শাহেদ মোস্তফাকে পাবনা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. রেজাউল করিমকে ঢাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ এনামূল আহসানকে রংপুর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ফরিদপুরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোহাম্মদ আশেক হাসানকে যশোর, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব সৈয়দ এনামুল কবিরকে মেহেরপুর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সচিব (উপসচিব) মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামকে নোয়াখালী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ আলম হোসেনকে গাজীপুর, এস্টাবলিশমেন্ট অব ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লাকে গাইবান্ধা, ভূমি সংস্কার বোর্ডের উপ ভূমি সংস্কার কমিশনার অন্নপূর্ণা দেবনাথকে কুড়িগ্রাম, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব জাহাঙ্গীর আলমকে মাদারীপুর, দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক তৌহিদুজ্জামান পাভেলকে মৌলভীবাজার, ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিটের সহকারী পরিচালক মো. খায়রুল আলম সুমনকে বরিশাল, কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের উপসচিব তাছলিমা আক্তারকে বরগুনা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব নাজমা আশরাফীকে রাঙামাটির ডিসি করা হয়। তাদের অনেকই এখনো মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।

